মহানবীর কূটনৈতিক সাফল্য

· Prothom Alo

হিজরির নবম বছরে আরবের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রতিনিধিদলগুলোর ধারাবাহিক আগমন তাঁর নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ইসলামের ইতিহাসে এ বছর পরিচিতি পেয়েছে ‘আমুল উফুদ’ বা প্রতিনিধিদলের বছর নামে।

এ সময় মদিনায় আসা প্রতিনিধিদের সবার উদ্দেশ্য এক ছিল না। কেউ এসেছিলেন ইসলাম সম্পর্কে জানতে, কেউ আনুগত্যের অঙ্গীকার করতে, কেউ নিজেদের গোত্রের অবস্থান জানাতে, আবার কেউ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করতে।

Visit newsbetsport.bond for more information.

রাসুল (সা.) প্রত্যেকের সঙ্গে পরিস্থিতি অনুযায়ী কথা বলেছেন। কোথাও যুক্তি দিয়ে, কোথাও আন্তরিক অভ্যর্থনায়, কোথাও বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তিনি মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন।

প্রতিনিধিদলে কবি ও বক্তা ছিলেন। আরব সমাজে কবিতা ছিল সামাজিক প্রভাব বিস্তারের প্রধান মাধ্যম। তাই তাঁরা নিজেদের গোত্রের মর্যাদা ও গৌরব তুলে ধরতে চেয়েছিলেন।

নবম হিজরিতে কেন এত প্রতিনিধি

মক্কা বিজয়ের আগে আরবের অনেক গোত্র ইসলাম গ্রহণের প্রশ্নে সতর্ক অবস্থানে ছিল। কোরাইশ ছিল আরবের প্রভাবশালী গোত্রগুলোর একটি। তাদের সঙ্গে রাসুলের সংঘাতের পরিণতি কী হয়, তা দেখার অপেক্ষায় ছিল অনেকে।

অষ্টম হিজরিতে মক্কা বিজয় এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ আরবের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আনে।

পবিত্র কোরআনে এ পরিবর্তনের কথা এসেছে এভাবে, ‘যখন আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় আসবে এবং আপনি মানুষকে দলে দলে আল্লাহর (মনোনীত) ধর্মে প্রবেশ করতে দেখবেন।’ (সুরা নাসর, আয়াত: ১–২)

মক্কা বিজয় ও তায়েফের প্রতিনিধিদলের ইসলাম গ্রহণের পর আরবের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষের আগমন বাড়তে থাকে। নবম হিজরিতে এর ব্যাপকতা এতটাই বেড়ে যায় যে, বছরটি ‘আমুল উফুদ’ নামে পরিচিতি লাভ করে।

তবে প্রতিনিধিদলের আগমন নবম হিজরিতেই প্রথম শুরু হয়েছিল, বিষয়টি এমন নয়। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে প্রতিনিধিদল মদিনায় এসেছিল। (ইবনে হিশাম, আস–সিরাতুন নাববিয়্যাহ, ৪/২০৩, দারুল কিতাব আল–আরবি, বৈরুত, ১৯৯০)

হারবুল ফিজার: তরুণ নবীজির প্রথম যুদ্ধ-অভিজ্ঞতা

বনু তামিম: বুদ্ধিবৃত্তিক মোকাবিলা

আরবের প্রভাবশালী গোত্রগুলোর মধ্যে বনু তামিম ছিল অন্যতম। নবম হিজরিতে এ গোত্রের এক প্রতিনিধিদল মদিনায় আসে। তাদের কিছু সদস্য নবীজির কক্ষগুলোর বাইরে দাঁড়িয়ে উচ্চস্বরে তাঁকে ডাকাডাকি শুরু করেন।

এ প্রসঙ্গে কোরআনে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই যারা কক্ষগুলোর বাইরে থেকে আপনাকে উচ্চস্বরে ডাকে, তাদের অধিকাংশই বোঝে না। আপনার বের হয়ে তাদের কাছে যাওয়া পর্যন্ত যদি তারা অপেক্ষা করত, তবে এটা তাদের জন্য কল্যাণকর হতো।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত: ৪–৫)

গুরুত্বপূর্ণ কারও সঙ্গে সাক্ষাতে সংযম প্রয়োজন, এ ঘটনা সেই শিক্ষা দেয়। তবু রাসুল (সা.) তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও আলোচনা থেকে বিরত থাকেননি।

এই প্রতিনিধিদলে কবি ও বক্তা ছিলেন। আরব সমাজে কবিতা ছিল সামাজিক প্রভাব বিস্তারের প্রধান মাধ্যম। তাই তাঁরা নিজেদের গোত্রের মর্যাদা ও গৌরব তুলে ধরতে চেয়েছিলেন।

জবাবে নবীজি সাহাবি সাবিত ইবনে কায়েসকে বক্তৃতার মাধ্যমে এবং হাসসান ইবনে সাবিতকে কবিতার মাধ্যমে উত্তর দেওয়ার দায়িত্ব দেন।

এই মোকাবিলার পর তামিম গোত্রের নেতারা মুসলিম পক্ষের বক্তা ও কবির শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করেন এবং ইসলাম গ্রহণ করেন। এতে বোঝা যায়, ইসলাম প্রচারে কবিতা, সাহিত্য ও বাগ্মিতাকেও যথাযথভাবে কাজে লাগানো হয়েছে। (ইবনে হিশাম, আস–সিরাতুন নাববিয়্যাহ, ৪/২০৫–২১০, দারুল কিতাব আল–আরবি, বৈরুত, ১৯৯০)

দলের নেতা আশাজ আবদুল কায়সকে উদ্দেশ করে রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমার মধ্যে এমন দুটি গুণ রয়েছে, যা আল্লাহ ভালোবাসেন—সহনশীলতা ও ধীরস্থিরতা।’

বনু আবদিল কায়স: আন্তরিক অভ্যর্থনা

বনু আবদিল কায়েসের প্রতিনিধিদের সঙ্গে রাসুল (সা.) খুবই আন্তরিকতা প্রদর্শন করেন। তাঁদের স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সেই প্রতিনিধিদলকে স্বাগতম, যারা লাঞ্ছিত ও অনুতপ্ত না হয়ে এসেছে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৩)

তাঁদের আগমনের উদ্দেশ্য ছিল ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন। নবীজি (সা.) তাঁদের প্রশ্নের জবাবে ইমান ও ইবাদতের মৌলিক বিষয়গুলো শিখিয়ে দেন।

দলের নেতা আশাজ আবদুল কায়সকে উদ্দেশ করে রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমার মধ্যে এমন দুটি গুণ রয়েছে, যা আল্লাহ ভালোবাসেন—সহনশীলতা ও ধীরস্থিরতা।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৭)

কারও চরিত্রের ইতিবাচক দিক প্রকাশ্যে স্বীকৃতি পেলে তার মনে আস্থা জন্মায়। এই সম্পর্ক শুধু আনুষ্ঠানিক সৌজন্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি।

ইসলামের আলোকে প্রতিনিধি নির্বাচন

বনু হানিফা ও মোসাইলামা

বনু হানিফার প্রতিনিধিদলের সঙ্গে ছিল মোসাইলামা, যে পরবর্তী সময়ে মিথ্যা নবুয়তের দাবি করে মুসলিম সমাজে বড় বিপর্যয় সৃষ্টি করেছিল। সে নবীজির কাছে নেতৃত্বের অংশীদারত্ব চায়।

রাসুল (সা.) স্পষ্ট ভাষায় তা প্রত্যাখ্যান করে বলেন, এমনকি খেজুরগাছের একটি ছোট ডাল চাইলেও তিনি তা দেবেন না। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৬২০)

নবীজি (সা.) তার বক্তব্য শুনেছেন, কিন্তু নবুয়ত ও আল্লাহর বিধানের মতো মৌলিক প্রশ্নে এক চুলও ছাড় দেননি। ইয়ামামার যুদ্ধে আবু বকরের খেলাফতকালে মুসলিম বাহিনীর হাতে মুসাইলামা নিহত হয়। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪০৭৮)

তার ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, সব আগমন সত্য গ্রহণের নিদর্শন নয়। কূটনৈতিক সম্পর্ক রক্ষার পাশাপাশি মানুষের অভিপ্রায় ও বক্তব্যের প্রকৃতিও বুঝতে হয়।

ইসলাম গ্রহণকারী গোত্রগুলো নিজ এলাকায় এর শিক্ষা ছড়িয়ে দিয়েছেন। ফলে ধর্মীয় পরিবর্তনের পাশাপাশি সামাজিক সম্পর্ক ও রাজনৈতিক বাস্তবতাও বদলাতে শুরু করে।

আমুল উফুদের তাৎপর্য

আমুল উফুদের বড় তাৎপর্য হলো, এর মাধ্যমে আরবের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হয়। প্রতিনিধিরা মদিনায় এসে নবীজির বক্তব্য শুনেছেন, ইসলামের বিধান জেনেছেন এবং নিজ গোত্রের জন্য সিদ্ধান্ত নিয়ে ফিরে গেছেন।

ইসলাম গ্রহণকারী গোত্রগুলো নিজ এলাকায় এর শিক্ষা ছড়িয়ে দিয়েছেন। ফলে ধর্মীয় পরিবর্তনের পাশাপাশি সামাজিক সম্পর্ক ও রাজনৈতিক বাস্তবতাও বদলাতে শুরু করে।

তাই আমুল উফুদকে একমাত্রিক ঘটনা না ভেবে বিভিন্ন গোত্রের সঙ্গে নবীজির বহুমাত্রিক যোগাযোগের ঐতিহাসিক অধ্যায় হিসেবে দেখাই অধিক যথাযথ।

নবীজির কূটনৈতিক প্রজ্ঞা থেকে শিক্ষা

এসব ঘটনা থেকে চারটি শিক্ষা পাওয়া যায়—মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে হলে তাদের কথা শোনার ও বোঝার মানসিকতা থাকতে হবে। সম্মানজনক আচরণ ও ইতিবাচক গুণের স্বীকৃতি পারস্পরিক আস্থা বাড়ায়।

সংলাপের সুযোগ দেওয়া মানে নিজের আদর্শ বিসর্জন দেওয়া নয়। দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের জন্য শুধু শক্তি প্রয়োগ যথেষ্ট নয়; জ্ঞান, যুক্তি, উত্তম আচরণ ও মানুষের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

  • ফয়জুল্লাহ রিয়াদ: শিক্ষক, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, ঢাকা

    [email protected]

আল্লাহর সঙ্গে তাঁর বান্দার যোগাযোগ হয় সুরা ফাতিহা পড়লে

Read full story at source